ভাষা আন্দোলনে টাঙ্গাইল এবং কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০

বাঙালি জাতির মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত রচিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলন এবং তার বিজয়ের মধ্য দিয়েই। মুক্তিযুদ্ধের মতোই ভাষা আন্দোলনেও টাঙ্গাইলের ভূমিকা অগ্রগণ্য। বৃটিশ শাসনামলে ভারতের অবভিক্ত বাংলায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছিলেন তৎকালীন আইন পরিষদের সদস্য ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। মায়ের ভাষা রক্ষার দাবিতে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বেই সর্বপ্রথম রাজনৈতিকভাবে নেতৃবৃন্দ সংগঠিত হন। টাঙ্গাইলের সন্তান শামছুল আলম ও শামসুল হকের শক্তিশালী নেতৃত্ব চিরস্বরণীয়। এছাড়া আব্দুল মান্নান, ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ, ডাঃ মির্জা মাজহারুল ইসলাম, বেগম ফজিলাতুন্নেসা, সোফিয়া খান, হাতেম আলী খান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ ও আব্দুস সালাম ভাষা আন্দোলনে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার স্বাধীনতা অর্জনে অকাতরে যারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তারা অমর, পথপ্রদর্শক। সেই মহান ব্যক্তিদের স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। এর ধারাবাকিতায় টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার নির্মাণের রয়েছে বিরল ইতিহাস। বর্তমানে শহরের নিরালা মোড়ে সাধারণ পাঠাগারের পশ্চিম পাশে নির্মিত শহীদ মিনারটি তৃতীয় সংস্করণ। টাঙ্গাইলের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার হচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
জানা যায় ১৯৫২ সালের তৎকালীন সময়ে একতলা দালানের নাম ছিল রমেশ হল। ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে ছাত্রনেতারা শহীদ হবার পর রমেশ হলের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে শহীদ মিনার স্থাপনের পরিকল্পনা হয়। সেই মোতাবেক নেতা খোদা বখশ মোক্তার শহীদ মিনার স্থাপনের জন্য মোহর রাজ নামের এক রাজ মিস্ত্রি নিযুক্ত করেন। বিন্দুবাসিনী স্কুলের পাকা ভবন তৈরির জন্য রাখা ইট, বালু ব্যবহার করা হয় শহীদ মিনার তৈরিতে। এতে শামসুর রহমান খান শাজাহান, ফজলুর রহমান কায়ছার, বদিউজ্জামান খান, ফজলুর রহমান ফজলু, মির্জা তোফাজ্জাল হোসেন মুকল, রমিনুজ্জামান রইজ, আলী আকবর খান খোকা, সৈয়দ আব্দুল মতিন, আবু সাঈদ, শামসুল আলম সিদ্দিকী দুদু, নারায়ণ বিশ^াস ও ঋষিকেশ পোদ্দারসহ আরো কয়েকজন ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়ে রমেশ হলের পাশে টাঙ্গাইলে সর্বপ্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন।
সর্বপ্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের সাথে জড়িত একমাত্র জীবিত ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বিশিষ্ট কবি বুলবুল খান মাহবুব বলেন, রক্তঝরা ভাষা আন্দোলনেও টাঙ্গাইলবাসীর ভূমিকা অত্যন্ত অপরসীম। টাঙ্গাইলের সর্বপ্রথম শহীদ মিনার স্থাপনে আমি অংশ নিতে পেরে নিজেতে ধন্য মনে করি। যদিও আমি অনেক ছোট ছিলাম। আজ এই শহীদ মিনারে জাতীয় দিবসগুলোতে সবাই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কিন্তু টাঙ্গাইলের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার তৈরির কঠিন দুঃসাহসিক ইতিহাস অনেকেই জানেন না। ভাষা আন্দোলনে যেমন টাঙ্গাইলের বেশ কয়েকজন নেতা, ছাত্রনেতা জাতীয় পর্যায়ে সামনে থেকে সাহসের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঠিক তেমনি তৎকালীন সময়ে টাঙ্গাইলে অবস্থান করেও জীবন ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলকে বেগবান করেছেন টাঙ্গাইলের ছাত্র সমাজ। এতে অনেকে চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান খান ফারুক বলেন, বাঙ্গালী জাতি সত্ত্বার পরিচায়ক বাংলা ভাষা। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিকৃতি হচ্ছে শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালে টাঙ্গাইলে সর্বপ্রথম শহীদ মিনার স্থাপন করা হলেও আইয়ুব খানের শাষন আমলে ভেঙে ফেলা হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ পাঠগার কর্তৃপক্ষসহ সরকারি উদ্যোগে সেইস্থানেই শহীদ মিনারটি দ্বিতীয়বার একটু বড় আকারে নির্মিত হয়।

বর্তমানে দন্ডায়মান টাঙ্গাইলের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারটি টাঙ্গাইল পৌরসভার অধীনে ২০০২-২০০৩ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে। টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন বলেন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ভাষা আন্দোলনের ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা করেছি। কিন্তু জায়গার সংকট রয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গণসঙ্গীত শিল্পী এলেন মল্লিক বলেন, শহীদ মিনার আমাদের প্রেরণার অন্যতম উৎস। টাঙ্গাইল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের তীর্থস্থান। তাই টাঙ্গাইলবাসীর কাছে শহীদ মিনারটি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে আসছে। শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষার্থে কর্তৃপক্ষকে আরো যত্নবান হতে হবে। সেইসাথে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ব্যবহারের অনুমতির শর্ত সহজ করতে হবে।
মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধ করা কিংবা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বাঙ্গালী জাতির ক্ষেত্রেই ঘটেছে। তাই জাতিসংঘের ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘ আমাদের সম্মান জানালেও আমরা কি পারছি এর যথাযথ মর্যাদা দিতে? আদালতের নির্দেশনার পরেও আজো বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি বাংলা ভাষার নির্ভুল ব্যবহার। জুতা পায়ে শহীদ মিনারের চলছে অনবরত চলাফেরা।

-লেখক:কাজল আর্য, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি. দৈনিক আমাদের সময় :