পাহাড়ে আতঙ্কের নাম খোরশেদ ডাকাত

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০
আতঙ্কের নাম খোরশেদ ডাকাত

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পশ্চিম দিকে ভর ও পূর্বদিকে পাহাড়ী অঞ্চলে বিস্তৃত। ঘাটাইল কলেজ মোড় থেকে ৩ কিলোমিটার পূর্বেই অবস্থিত এই পাহাড়ী অঞ্চল। চির সবুজ গাছ-গাছালির সমারোহ আর উঁচু নিচু টিলার সমন্বয়ে এই অঞ্চল। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য্যের লীলাভূমিতে পশু পাখির গুঞ্জনে মুখরিত হওয়ার কথা কিন্তু সেখানে নতুন করে ডাকাত দলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন খোরশেদ বাহিনী। তাদের সীমাহীন কর্মকান্ডে পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকটাই অঘোষিত ভাবেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে এই বাহিনী। মাদক ব্যবসা, জুয়া, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, লুটসহ খোরশেদ ডাকাতের নামে রয়েছে অর্ধশতাধিক মামলা। এই ডাকাত বাহিনীর মাধ্যমে পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষদের জিম্মি করে রেখেছে এরা। এদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নিজের ঘাড়ে বিপদ ডেকে আনা। সাতকুয়া, কোচক্ষিরা, মালাজি, সন্ধানপুর এসব অঞ্চলে রয়েছে তার বাহিনীর আধিপত্য। এক সময় অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবন চালাতেন এই খোরশেদ। অভাবের তাড়নায় এক সময় বনের গাছ চুরি করতে নামেন তিনি। গাছ চুরি করতে করতে এখন সে আতঙ্কিত এক গড ফাদার। ইতিমধ্যেই নারী নির্যাতনের মামলায় সাত বছর জেল খেটেছেন। নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পলাতক মামলার আসামী নিয়ে গঠন করে খোরশেদ বাহিনী। এই বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে জামাল, শহীদ, আক্তার, মাসুদ, ভানু, হাবিব। হাবিব আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রস ফায়ারে নিহত হন। খোরশেদের বাড়ী সন্ধানপুরে। তার বাবা নবাব আলী। খোরশেদের শ্বশুর সেকান্দর আলী। যিনি সেকান্দর ডাকাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার অপরাধ এতই ভয়ঙ্কর যে, কেউ সাহস করে কথা বললে, তার উপর চলে ব্যাপক নির্যাতন। জানা যায়, আবু হানিফ ও মকবুল নামের দু’ব্যক্তি খোরশেদের বিরুদ্ধে বনের গাছ চুরির মামলায় সাক্ষ্য দেয়ায় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের বাড়ি গিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে আহত করেন। স্থানীয়রা জানান, মাঝরাতে সড়কে প্রায়ই মানুষের আর্তনাদ শোনা যায়, সকালে তাঁজা রক্তের দাগও মিলে কখনো কখনো। একদল ডাকাত রাত হলেই অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। বিশেষ করে গরু, অটোরিক্সা, মোটর সাইকেল, সিএনজি ছিনতাই করে নিয়ে যায় এরা। এদের ভয়েই রাত ১০ টার পরে পাহাড়ী মানুষ রাস্তায় চলাচল বন্ধ করে দেয়। জরুরি প্রয়োজনে রাতের বেলায় চলতে গেলেও টহলরত পুলিশ চলাচল করতে নিষেধ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একভুক্ত ভোগী বলেন, রাত দুইটায় সন্তান সম্ভাব্য স্ত্রীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় সিএনজি থামিয়ে চালকের কাছ ৩ হাজার টাকা ও চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসার আমার ৯ হাজার টাকা ডাকাত দল নিয়ে যায়। আমরা পাহাড়ের মানুষেরা এ ডাকাত দলের হাত থেকে বাঁচতে চাই। এদের বিরুদ্ধে রয়েছে বন বিভাগের গাছ চুরি, জায়গা জমি-জমা দখলসহ একাধিক মামলা। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা খোরশেদ বাহিনীর সাথে আতাত করে বনের গাছ চুরি ও অবৈধভাবে জায়গা দখলে মেতে উঠেছেন।
সম্প্রতি আলোচিত তিন স্কুল ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত রয়েছে খোরশেদ বাহিনীর সদস্যরা। গত ২৬ জানুয়ারি চার শিক্ষার্থী ঘাটাইল উপজেলার সন্ধানপুর ইউনিয়নের সাতকুয়া নামক স্থানে বেড়াতে যায়। পরে সেখানে ৫-৬ দুর্বৃত্ত তিন ছাত্রীকে ধর্ষণ ও আরেক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান খোরশেদ বাহিনীই এই ৩ ছাত্রীকে ধষর্ণ করে। তবে এ বিষয়ে এলাকাবাসী খোরশেদ বাহিনীর ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, তিন স্কুল ছাত্রীসহ কয়েকজন সেদিন বেড়াতে আসেন সাতকুয়া গ্রামে পাহাড়ী অঞ্চলে। পাশের এক টিলায় আমি পাতা কুড়াচ্ছিলাম হঠাৎ করে মেয়েদের চিৎকার শুনতে পাই, এগিয়ে গিয়ে দেখলাম খোরশেদসহ তার ডাকাত বাহিনী মেয়েদেরকে গাছের সাথে বেঁধে আটকিয়ে রেখেছে, আমি সামনের দিকে না যেয়ে ভয়ে চলে যাই। কারণ সেখানে খোরশেদের লোকজন রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ী অঞ্চলে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের বেঁধে রেখে নির্যাতন করে সর্বস্ব কড়ে নেয় খোরশেদের লোকজন। খোরশেদ সহ তার লোকজন এতটাই ভয়ানক যে, পাহাড়ী অঞ্চলের কোন স্কুল ছাত্রী, যুবতী মেয়ে তার অত্যাচারে এলাকায় থাকতে পারেন না। এসব মেয়েকে তিনি ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে থাকেন বলেও জানান স্থানীয়রা। আর এ ব্যাপারে মুখ খুললেই রাতের আঁধারে তাদের বাড়িতে গিয়ে হামলা চালানো হয়। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, সন্ধানপুর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. হায়দার আলী বলেন, খোরশেদ ডাকাত মেম্বার নির্বাচন করবেন তাই আমাকে মেম্বার পদ প্রত্যাহার করে নিতে বলছেন। আর যদি আমি তা না করি তাহলে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। এ বিষয়ে মো. হায়দার আলী ঘাটাইল থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডাইরি করেছেন।
সাতকুয়া গ্রামের হুরমুজ বলেন, সরকারীভাবে আমাকে সামাজিক বনায়নের একটি প্লট দেয়। গত ১০ বছর গাছ পরিচর্যা করে বড় করেছি। বিক্রি করার উপযুক্ত সময় এখন। কিন্তু খোরশেদ তার বাহিনী নিয়ে আমার প্লটের সব গাছ দিনের বেলায় কেটে নিয়েছে। আমি প্রতিবাদ করলে আমার বাড়িতে হামলা চালায় এবং আমাকে মেরে আহত করে। শুধু হুরমুজের গাছ নয়, প্রায় ৪৫ হেক্টর সরকারি বন ভূমির গাছ কর্তন করেছে বলে জানান স্থানীয়রা। যার মূল্য ছিল প্রায় কয়েক কোটি টাকা। খোরশেদ পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন মাদকের অভয়াশ্রম। রাতের আঁধারে মাদক বেচা-কেনা করেন তার বাহিনী। ২০১৬ সালে জিবিজি কলেজের সাবেক ভিপি আবু সাঈদ রুবেলকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করে এই খোরশেদ ডাকাত। জানতে চাইলে উপজেলা চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম লেবু সাপ্তাহিক জাহাজমারাকে বলেন, গত কয়েক মাস আগে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় কমিটির মিটিং এ তার বিরুদ্ধে আলোচনা হয়। আলোচনায় খোরশেদ বাহিনীর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া আলোচিত তিন স্কুল ছাত্রী ধর্ষনের ঘটনায় খোরশেদ ডাকাত ও তার বাহিনী জড়িত। খোরশেদ ডাকাতকে এ বিষয়ে থানায় নিয়ে আসা হলেও অজ্ঞাত কারণে তিনি থানা থেকে বের হয়ে যান। এই ধর্ষণের মামলায় যদি খোরশেদ ডাকাতকে আটক করে রিমান্ডে নেওয়া হতো তাহলে অনেক কিছু বের হয়ে আসত বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, খোরশেদ ঘাটাইল পাহাড়ী অঞ্চল সন্ত্রাসের অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বন উজার, পাহাড়ের মাটি কাটা, নারী ধষর্ণ মাদক ব্যবসা সহ সকল অপকর্মের মূল হোতা তিনি। তিনি বলেন, কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা তার সাথে আতাত করে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। টাঙ্গাইলের বিগত দিনে যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে এসেছেন, তাদেরই ছত্র ছায়ায় খোরশেদ ডাকাত এই আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন বলে তিনি জানান। আলোচনায় সবাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং তার ক্রস ফায়ার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, খোরশেদ ডাকাত সম্পর্কে আমরা অবগত আছি, তার বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।