শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

আজও চিহ্নিত হয়নি ভাষাশহীদ রফিকের কবর, অরক্ষিত জন্মভিটা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০

আজ শুক্রবার শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিনটি বাঙালি জাতীর এক শোকাবহ দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলার অকুতোভয় দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করে সৃষ্টি করেছিল এক বিরল ইতিহাসের। ভাষা আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রতিষ্ঠাই নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপন করা হয়েছিল। সেই আন্দোলনের প্রথম ভাষাশহীদ হয়েছিলেন রফিক উদ্দিন আহমেদ। দীর্ঘ ৬৮ বছর পর কেমন আছেন ভাষা সৈনিক রফিকের পরিবার আর তার স্মৃতি রক্ষার্থে সরকার কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা জানতেই রফিকের জন্মভূমি মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রাম সরেজমিন পরিদর্শন ও স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে প্রতিবেদনটি লিখেছেন সিঙ্গাইরের মোবারক হোসেন।

জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রফিক নগর (পূর্বের পারিল) গ্রামের মরহুম লতিফ মিয়া ও রাফিজা খাতুনের জ্যৈষ্ঠ পুত্র ছিলেন ভাষাসৈনিক রফিক উদ্দিন আহমেদ। ভাষা আন্দোলনের সময় রফিকের বিয়ে ঠিক হয়েছিল প্রতিবেশি রাহেলা খানম পানু বিবির সাথে। কিন্তু বিয়ের পিঁড়িতে বসার সৌভাগ্য হয়নি তার। শোনা হয়নি বিয়ের সানাইয়ের সুর।

২১ ফেব্রুয়ারি বিয়ের কেনাকাটার জন্য ঢাকার বাসা থেকে বের হন রফিক। বিয়ের কেনাকাটা বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আয়োজিত ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগ দেন তিনি। সেই মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রফিক।

ভাষা দিবস আসলে শহীদ রফিকের জন্মভিটার অদূরে নির্মিত স্মৃতি যাদুঘরে হাজারো মানুষের ঢল নামলেও তাঁর অন্দরমহল খবর নেয় না কেউ। কেমন আছেন ভাষা শহীদের পরিবার আর কিভাবেই বা চলছে তাঁদের জীবন সংসার, সে কথা জানা নেই কারো। জাতীর এই কৃপণতায় মানসিকভাবে প্রচণ্ড আহত ভাষা প্রেমিক ও শহীদ রফিকের পরিবার।

রফিক উদ্দিন আহমদের স্মৃতি রক্ষার্থে ২০০৬ সালে তাঁর জন্মভূমি পারিল গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিক নগর করা হয়। গ্রামের নাম পরিবর্তন হলেও বদলায়নি জনপথটির আর্থসামাজিক অবস্থা। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা ছিল, উন্নয়ন হবে এলাকাটির। প্রসার ঘটবে শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় হতাশ এলাকাবাসী।
স্থানীয় সমাজহিতৈষী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) মজিবুল ইসলাম খান পাশার দানকৃত ৩৪ শতাংশ জমির ওপর ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। দীর্ঘদিনেও তা পূর্ণতা পায়নি। সেখানে শহীদ রফিকের দুটি ছবি ও কিছু বই ছাড়া স্মৃতিবিজরিত কিছুই নেই।

শহীদ রফিকের ব্যবহৃত চেয়ার টেবিল, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি এবং নিজ হাতে তৈরি নকশা করা রুমালসহ অনেক জিনিসপত্র স্বজনদের হেফাজতে থাকলেও এসবের ঠাঁই মেলেনি জাদুঘরে। এমনকি রফিকের মরণোত্তর একুশে পদকটিও। স্মৃতি জাদুঘরে নেই কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ। ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিনদিন জৌলুস হারাচ্ছে। পরিচর্যার অভাবে চত্বরজুড়ে লাগানো সব ফুল গাছ মরে গেছে।

জাদুঘরের হলরুমে প্রায়ই বিচার-শালিস বসান প্রভাবশালীরা। ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।

এদিকে, শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের পৈতৃক ভিটায় নির্মিত শহীদ মিনারটি অরক্ষিত। সীমানা প্রাচীর না থাকায় বর্ষা ও ভারিবর্ষণে শহীদ মিনারটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় লোকজন। জন্মভিটাও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০০০ সালে বেসরকারি সংস্থা প্রশিকা দুটি আধা-পাকা ঘর তৈরি করে দেয়। সেখানে থাকেন শহীদ রফিকের প্রয়াত ভাই আব্দুল খালেকের সত্তরোর্ধ স্ত্রী গুলেনুর বেগম ও ভাতিজা শাহাজালালের পরিবার।

রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম ও পরিবারের অন্য সদস্যরা থাকেন জেলা শহর মানিকগঞ্জ ও ঢাকায়। বাড়িটিতে আত্মীয় স্বজন ও দর্শনার্থীদের থাকার উপযোগী কোনো ঘর নেই। নেই স্বাস্থ্যসম্মত একটি শৌচাগারও।

শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের ভাই প্রয়াত আব্দুল খালেকের গুলেনুর বেগম বয়সের ভারে ন্যুজ। এই বিধবা নারী নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। লাঠি ভর দিয়ে চলতে হয় তাকে।

গুলেনুর বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ভাষা দিবস মাস আসলে অনেকেই আসেন, সারাবছর কত কষ্টে দিন কাটে সে খবর কেউ রাখে না। শহীদ রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে বাড়িটি আঁকড়ে ধরে আছি। ভালো ঘর-দরজা নাই। দেশ-বিদেশ থেকে বহু কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্মৃতি জাদুঘর এবং রফিকের বাড়ি দেখতে আসেন। থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েন তারা। হতাশ হয়ে ফিরে যান। ভাষা দিবসে স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারে হাজারো মানুষ আসলেও ভেতর বাড়ির খবর নেয় না কেউ।

শহীদ রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম বলেন, শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদকে কবর দেওয়া হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে। এখনো তার কবরটি চিহ্নিত করা হয়নি। কবরটি চিহ্নিত করে নামফলক লাগানো হলে দোয়া-দরুদ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা যেত। তাছাড়া ঈদ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসহ বিশেষ দিনে রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সরকারপ্রধানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুযোগ পান। পেয়ে থাকেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু ভাষা দিবসে ভাষা সৈনিকদের পরিবারের সদস্যদের খবর নেওয়া হয়না। বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মাজেদ খান বলেন, সারা বছর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন দর্শনার্থীদের সংখ্যা কমছে। এছাড়া রফিকের বাড়ির সড়কটি ভাঙাচোরা ও সরু। সড়কটি প্রসস্ত করা দরকার। দর্শনার্থীদের থাকা খাওয়ার জন্য একটি ডাকবাঙলো নির্মাণ ও রফিকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

সিঙ্গাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুনা লায়লা বলেন, আমি এই উপজেলায় নতুন এসেছি। ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। খোঁজ-খবর নিয়েছি ভাষা শহীদের পরিবারের। শহীদ রফিকের বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।