ঘাটাইলে এমদাদ চেয়ারম্যানের সাম্রাজ্যে মুখখোলা বারণ

প্রকাশিত: নভেম্বর ১২, ২০১৯

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে নতুন করে সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন রসুলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমদাদ হোসেন। এই চেয়ারম্যানের সাম্রাজ্যে মুখ খোলা বারণ। বিরোধী দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এমনকি খোদ আওয়ামীলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা কেউ মুখ খুলতে পারেন না এর বিরুদ্ধে। মুখ খোলা মানে নিজের ঘাড়ে বিপদ টেনে আনা। অনেকটা অঘোষিত ভাবেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এই চেয়ারম্যান। মাদক ব্যবসা, জুয়া, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, সরকারি উন্নয়নের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব সন্ত্রাসীবাহিনীর মাধ্যমে ইউনিয়নবাসীকে জিম্বি করে রেখেছেন এই চেয়ারম্যান। এক সময়ে অন্যের বাড়িতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এমদাদ চেয়ারম্যান। ১৯৯৭ সালে বিএনপি থেকে আওয়ামীলীগে যোগদেন তিনি। গত ২০১৮ সালে নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর পাল্টে যায় তার খোলস। তিনি এক সভায় গর্ব করে বলেন আমি চেয়ারম্যান, আমি সব পারি, আমি রাজা, আপনারা সবাই আমার প্রজা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়ন্ত্রন করেন ইউনিয়নের সব ধরণের অপকর্ম। ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় তার রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক। তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাদক, নারী ঘটিত ঘটনা, জমি দখল, শালিশ বৈঠকসহ অনেক কিছু। তার এই আধিপত্য থেকে রেহাই পাননি মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ ব্যবসায়ীসহ কেউই। আর এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যাবে এমন ধরণের কথা কারও মুখ ফসকে বের হলে নেমে আসে তার উপর নির্যাতনের খড়গ। এসব অপকর্মের কারণে ইউনিয়নের মেম্বারদের মাঝে বিরাজ করছে অসন্তোষ।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, রসুলপুর গ্রামের ফজিলা খাতুন বলেন, আমার সন্তান সিয়াদ ও মায়ের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আদালতে মিথ্যা অপহরণ ও ধর্ষন মামলা করি। চেয়ারম্যান আমাকে বলেন, আমার কথা মতো যদি মামলা না করিস তবে তোর ৯ বছরের ছেলে ও তোর মাকে খুন করে তোকে গ্রাম ছাড়া করব। আমি চেয়ারম্যান, আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তুই জানিস না। মামলা করার আগে চেয়ারম্যান তার গুন্ডা বাহিনী দিয়ে আমাকে প্রধান আসামী মোফাজ্জলের বাড়িতে জোর করে উঠাইয়া দেয়। মোফাজ্জলের সাথে চেয়ারম্যানের শত্রুতা থাকায় তাকে শায়েস্তা করার জন্য আমাকে দিয়ে মিথ্যা মামলা করিয়েছেন। আমি যা করেছি আমার সন্তান, মা ও আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্য করেছি। গত ৩০ অক্টোবর করা কোর্ট এফিডেভিট এর ঘোষণাপত্রে এসব কথা বলেন রসুলপুর গ্রামের ফজিলা খাতুন। ফজিলা ক্ষণিকের দাসত্ববরণ করলেও বিবেকের তাড়নায় কোর্টে এসব কথা বলেন তিনি।

গত মাসের ৩ অক্টোবর পুলিশ সুপার ও ৭ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কাছে জান ও মালের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন লালমাটি রসুলপুর গ্রামের মো. মোফাজ্জল হোসেন। আবেদনে মোফাজ্জল হোসেন উল্লেখ করেন, চেয়ারম্যান এমদাদুল হক রাজনীতির নামে এলাকায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি করে আসছেন। বিভিন্ন কারণে সে সহ তার পরিবারের লোকজনকে খুন করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিবে বলে হুমকি দিচ্ছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বিষয়টি আমলে নিয়ে পৃথকভাবে ইউএনও এবং ওসিকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঘাটাইল থানার ওসি মাকছুদুল আলম।

গত মাসের শুরুতে ১ অক্টোবর চেয়ারম্যানকে প্রধান আসামী করে ঘাটাইল আমলী আদালত টাঙ্গাইলে সন্ত্রসী ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা করে ওই ইউনিয়নের ঘোনার দেউলি গ্রামের ছানোয়ার হোসেন। মামলায় উল্লেখ করেন, চেয়ারম্যান দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ৭ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে খুন করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেন। কিছু দিন পর এ মামলার বাদীর ভাই শাহাদাৎ হোসেন হালিমের ওপর পেচারআটা বাজারে চেয়ারম্যান তার বাহিনী নিয়ে হামলা করেন। গুরুতর আহত অস্থায় হালিমকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে টাঙ্গাইল শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ মামলায় চেয়ারম্যানসহ ৮ জনকে আসামী করা হয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ১ অক্টোবর ওই ইউনিয়নের লালমাটি রসুলপুর গ্রামের চায়না খানম নামে এক নারীকে চেয়ারম্যান হুমকি দেওয়ায় তিনি আদালতে মামলা করেন।

এদিকে তার ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান মেম্বার শাহাদাৎ হোসেন হালিম ও তার পরিবারের সদস্যদের মেরে হুমকি দেওয়ায় গত ৯ অক্টোবর তিনি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালতে চেয়ারম্যানকে ৩ নভেম্বর হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ করেছেন বলে জানান হালিম মেম্বার।

চেয়ারম্যান এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদের ৪০ দিন প্রকল্পের টাকা আতœসাতের অভিযোগ এনে ৪ সেপ্টেম্বর দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন মো. আবুল হোসেন। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি।
এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদেও রয়েছে তার একক আধিপত্য। পাঁচজন বর্তমান ইউপি সদস্য শাহাদৎ হোসেন হালিম, মর্তুজ আলী, নূরুল ইসলাম, ফজলুল হক ও পাপিয়া জানান, ইউনিয়ন পরিষদে আসা সরকারি কোনো কাজের বরাদ্দ আমাদের দেওয়া হয় না। আমাদের ওয়ার্ড গুলো সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা যারা তৃণমূল আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জরিত তাদের সে কোনো কাজ দেয় না।

রসুলপুর ইউনিয়ন আওয়মীলীগের সভাপতি মো.শহিদুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যান হয়ে চেয়ারে বসার আগে এমদাদুল হক সরকার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, আমি আপনাদের রাজা আর আপনারা সবাই আমার প্রজা। তিনি অনেক কালো টাকার মালিক হয়েছেন। তার ভিতর অনেক অহংকার কাজ করে। চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি পাজারো গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ান।

জানা যায়, এমদাদুল হক আগে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর ৯৭ সালে তিনি ঘাটাইল জিবিজি কলেজ মাঠে এক জনসভায় অনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামীলীগে যোগ দেন।
ঘাটাইলের রসুলপুর ইউপি চেয়ারম্যান এমদাদুল হক সরকারের হাত থেকে ছেলের জীবন বাঁচাতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন রসুলপুর গ্রামের মো.খোরশেদ খান (৭০) নামে এক বৃদ্ধ। গত ৬ নভেম্বর তার ছেলে মো.আনিছুর রহমান খানের (৪৫) জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি এ আবেদন করেন।

নিরাপত্তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে করা লিখিত আবেদন ও খোরশেদ খানের সাথে কথা বলে জানা যায়, আনিছুর, বাদশা, জাহাঙ্গীর ও তোফায়েল এদের চারজনের অংশিদারিত্বে উপজেলার ঘোনার দেউলি মাস্টার বাড়ি মোড় এলাকায় ’আকাশ বিকস্’ নামে ইটভাটা পরিচালিত হয়ে আসছে। অংশিদারিত্ব নিয়ে আনিছুরের সাথে অন্য তিন জনের দ্বন্ধ হয়। এ বিষয়টি চেয়ারম্যান যেভাবে সমাধান দেন সেভাবে আনিছুর মেনে না নেওয়ায় তার ছেলেকে চেয়ারম্যানসহ অন্য অংশিদাররা মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেন খোরশেদ খান। জেলা প্রশাসক আবেদনটি আমলে নিয়ে ইউএনও ঘাটাইলকে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। খোরশেদ খানের ছেলে আনিছুর রহমান বলেন, চেয়ারম্যান আমাকে ইটভাটার ভাগ থেকে সরিয়ে নিজে একাই ভাটার মালিক হতে চায়। আমি ভাগ না ছাড়ায় কিছু দিন আগে তিনি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন।

এছাড়াও চেয়ারম্যান এমদাদুল হক সরকার তার ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মনিরুল ইসলামের সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সাবেক কমান্ডারের মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই করবেন- এ মর্মে তাকে গত ৫ নভেম্বর নোটিশ দিয়েছেন এবং ১১ নভেম্বর গ্রাম আদালতে হাজির হতে বলেছেন তিনি।

এ বিষয়ে রসুলপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সনদ যাচাই করার তার কোনো অধিকার নেই। আমরা যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এমনকি যারা মুক্তিযোদ্ধা তারা আজ এই চেয়ারম্যানের হাতে নির্যাতিত।
ঘাটাইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাবেক কমান্ডার মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, নোটিশের কাগজ আমি দেখেছি। কোনো চেয়ারম্যানেরই আইনি বৈধতা নেই একজন মুক্তিযোদ্ধার সনদ যাচাই-বাছাই করার। আমরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে এর একটা বিহিত করব।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইউপি চেয়ারম্যান এমদাদ হোসেন বলেন, আমি চেয়ারম্যান আমি সব পারি, আমার যাকে সন্দেহ হবে অমি নোটিশের মাধ্যমে গ্রাম আদালতে হাজির করতে পারবো। মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম এর বিষয়ে আমার সন্দেহ হয়েছে তাই আমি তাকে মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়ে হাজির হতে বলেছি। এবং তিনি আরো বলেন আমার বিরুদ্ধে কিছু কুচক্রিমহল আমাকে হেয় করার জন্য এসব মিথ্যা ও বানোয়াট উদ্দেশ্যমূলক হয়রানি করে যাচ্ছেন। যে সব অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে এগুলোর কোন সত্যতা নেই।
মামলা বিষয়ে ঘাটাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকছুদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি মামলার তদন্ত কাজ চলছে।